বৃষ্টি পড়ছে।
আবহাওয়া বার্তায় অবশ্য বলাই ছিলো বিকেলের পর মুষলধারে বৃষ্টি পড়বে। শহরে বৃষ্টি উপভোগের কোনো অবকাশ নেই। সবাই কোনো না কোনো কাজে ব্যাস্ত। ফুটপাতের ওপর পথচারীরা দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। হকাররা হৈ-হুল্লোড় করে দিনের মতো বিক্রি গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। তৃষা অবশ্য মেঘের দিকেই তাকিয়ে আছে। আমরা বসে আছি একটা ছোটোখাটো কফিশপের ভেতর। কেউ দরজা দিয়ে ঢুকলেই টুং-টাং একটা আওয়াজ হচ্ছে। আপাতত আমার লক্ষ্য এই টুং-টাং আওয়াজেই। ছোটোবেলায় ঠিক একই আওয়াজের একটা খেলনা ছিলো আমার। আমি অতীতমুখী মানুষ না, কথায় কথায় নস্টালজিয়ায় ভোগার অসুখও আমার নেই। তবুও ভাবতে অবাক লাগে একটা নির্দিষ্ট শব্দ কিভাবে সময়ের ব্যাবধান ঘুচিয়ে অতীত-বর্তমানকে একই কাতারে নিয়ে আসতে পারে। তবে বর্তমানে দাঁড়িয়ে সহজে ভবিষ্যত জানা যায় না। এই টুং-টাং আওয়াজ ভবিষ্যতে এমনই কোনো আওয়াজের মুখোমুখি হবো এই বার্তা দেয় না, শুধু অতীতকেই নির্দেশ করে। ঘড়ির কাটা ঘুড়ছে, তৃষা এখনও চুপ, কফির কাপে মাঝেমাঝে নাড়া দিচ্ছে। আমি অবশ্য জানি ও কি বলতে এসেছে। এর জন্য আমিও তৈরি হয়ে এসেছি। তবে সত্যি বলতে তৃষাকে আজকে অন্যান্য দিনের চেয়ে সুন্দরই লাগছে। নাকি আজকেই প্রথম আমি ওকে অন্য দৃষ্টিতে দেখছি? ওর দৃষ্টি অবশ্য এখনো বাহিরেই, এক লোক বাঁশি বাজাচ্ছে। কফিতে চুমুক দিয়ে তৃষাকে ডাকলাম। 'তৃষা?' সে অবশেষে আমার দিকে তাকালো। একটু মুচকি হাসি দিলো। এমন হাসিতে অভিমানের সুর লেগে আছে। 'আজকের কফিটা তেমন ভালো হয়নি, তো কেমন আছো তুমি?' বাহিরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। স্পীকারে হালকা আওয়াজে গান বেজে চলছে। রবীন্দ্রসংগীত?
'মন হারাবার আজি বেলা, পথ ভুলিবার খেলা-
মন চায়, মন চায়
হৃদয় জড়াতে কার চিরঋণে'
কেমন থাকা উচিত আমার? চাইলেই কি ভালো থাকা সম্ভব হয়? চেষ্টা করা যায় অন্তত। কিন্তু সেই চেষ্টা করার ইচ্ছেটাও মরে গেলে? তবুও মুখে হাসি রেখেই বললাম 'এইতো আছি বেশ'। তৃষার চোখে জল টলমল করছে? করার কথাই অবশ্য। কারণ একমাত্র এই মেয়েটাই জানে ভালো আছি কথাটা প্রতিনিয়ত কতো কষ্ট করে বলতে হয় আমাকে। মাঝেমধ্যে মনে হয় সে হয়তো কখনো আমাকে ভালোবাসেনি, আমার কষ্টগুলোকে ভালোবেসেছে। করুণা? কে জানে। তবে মিথ্যে বলবোনা, এই শান্ত,শ্যামল সুন্দর মেয়েটা আগলে না রাখলে এতোদিনে অনেক কিছুই হয়ে যেতে পারতো আমার জীবনে। ভালোবাসার এই দিকটাই আমি চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারিনা। জীবনের একটা অর্থ হতে পারে ভালোবাসা। কি অদ্ভুত, এই বিশাল জীবনের মানে একটা মানুষকে ভালোবেসে পাওয়া গেলে তা হারানোর কড়া দামও গুণতে হয়। আমি তৃষার উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। অবশ্যম্ভাবী কোনো কিছু এড়ানো যায় না, তাই একে আটকে রেখেও লাভ হয় না। তৃষা অবশেষে কান্না আটকে রেখেই বললো, 'আমাকে চলে যেতে হবে' এর বিপরীতে কোনো কথা বলার অবস্থা আমার নেই। 'আমি জানি তুমি এখন আমাকে ছাড়াই থাকতে পারবা, রাশেদকে আমি ওষুধগুলো নিয়মিত দিতে বলে যাবো।আর…' সে বাকি কথাগুলো আর বলতে পারলোনা।।আমি নিথর হয়েই বসে আছি, অনূভুতি বাদ দিলে মানুষের মধ্যে আর কি বাকি থাকে? সেই জীবের মতোই আমার অবস্থা। মোনালিসার রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলে ভিঞ্চি যেমন অমর হয়ে গেছেন তেমনিভাবে তৃষার দুঃখটা কেউ কি ফুটিয়ে তুলতে পারবে? তৃষার হাতটা ধরলাম, হয়তো শেষবারের মতো। তৃষার চোখের জলে তৈরি হওয়া সমুদ্রে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মনে হচ্ছে বাস্তবতা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি, সরে যাচ্ছি। বৃষ্টি কমে গেছে। আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে রোদ দেখা দিচ্ছে। দূর মসজিদে আজান হচ্ছে। আসরের আজানটাই কি আবার দিচ্ছে? তাই যাতে হয় খোদা। আজকের বিকেলটা যাতে শেষ না হয়।।স্পীকারে হালকা আওয়াজে গান বেজে চলছে,
'Dreams are my reality
I like to dream of you
Close to me
I dream of loving in the night
And loving you seems right
Perhaps that's my reality'
0 Comments