১/ ঠান্ডা গোশত্ঃ
ঠান্ডা কুয়াশার চাদর ভেদ করে দোতলা লঞ্চটা এগিয়ে চলছে। শীতকালীন ভ্রমণে আমিও লঞ্চে করে ঘুরে-বেড়ানোটা কেনো পছন্দ করেছিলাম কে জানে। সাতসকালে উঠে পড়েছি,বেলা পর্যন্ত ঘুমানো আমার সয় না।।লঞ্চের ডেকে মানুষ নেই। এককোনার টেবিলে একটা পুরোনো পত্রিকা পড়ে আছে, আর ঠিক উল্টো দিকে সেই ছেলটা।।গতকাল রাত থেকে একই ভঙ্গিতে বসে আছে,এমন শীতের রাত এক কাপড়ে কাটিয়ে দেওয়া সহজ কথা না।।আমি গিয়ে টেবিলে বসে পত্রিকাটা উল্টালাম।।পত্রিকার ক্ষমতা অনেক।।একদিনের ব্যাবধানেই সাতটা ধর্ষণ, পাঁচটা খুন, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির খবর পুরোনো হয়ে যাবে।।দুনিয়াটা এমনই, সময়ের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে অনেক কিছুরই বিসর্জন দেওয়া লাগে।।এমন সময়ই ছেলেটার পানিতে লাফ দেওয়ার বিকট শব্দটা কানে আসলো।।পত্রিকায় যখন ছোটোবেলায় ছবি অথবা লেখা ছাপতো তখন ঈদের মতো খুশি হতো।।কালকের কাগজের এক কোনায় হয়তো ছেলেটার ছবিসহ খবর ছাপা হবে।।আফসোস, দেখতে পারবেনা সে।।সে একটা ভুল করেছে।। আত্মহত্যা করার আগে আয়নায় নিজের চেহারাটা একবার দেখলে হার কাঁপানো শীতের ভোরে মাঝ নদীতে জীবন বিসর্জন দিতোনা।।আত্মহত্যার আগে নিজের চেহারাটা একবার দেখলে মানুষ জমে যায়,একদম মরা লাশের মতো অথবা বরফ দেওয়া মৃত লাশের গোশতের মতো।।তখন আত্মহত্যাকেও বিলাসিতা মনে হয়।।
২/ জাহান্নামে আদমের জিকিরঃ
তেরা মিলনা, নেহি মিলনা; ইয়ে জান্নাত হ্যায় কেয়া অর জাহান্নাম কেয়া
৪/ প্রেমের মৃত্যু কথাঃ
শালিক পাখিটা আমার পাশেই আছে।।থাকার কথা না। গত একমাস ধরে পাখিটা আমি দেখে আসছি, কখনো আমার পাশে থাকেনি, উড়ে গেছে।।পাশে থাকলে জাত চলে যাবে এমন ভাব,অবশ্য এটা মানুষের ক্ষেত্রেও সত্য।। আমিও ভাব দেখিয়ে পাশ কেটে চলে যাচ্ছিলাম, এমন সময় পেছন থেকে নাম ধরে ডাক দিলো,মানুষের গলায়, বৃদ্ধ মানুষের গলায়৷। 'একটু শুনবে?' আমিও ভালো মানুষের মতো তার পাশের বেঞ্চে গিয়ে বসলাম।।সে একটু হাসি হাসি গলায় বলে উঠলো, 'পৃথিবীতে আজ আমার শেষ দিন,যাচ্ছি ঈশ্বরের সাথে দেখা করতে'। কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললাম,' তাহলে আমি কি করতে পারি?' শালিকরূপি বুড়োটা একটু নিচু স্বরে বললো, ' কিন্তু তার সাথে দেখা করার নিয়ম হলো একা দেখা করা যাবেনা।।সাথে অবশ্যই আরেকজনকে লাগবে,তাই আমি ভাবছিলাম অনেকদিন যেহেতু তোমার সাথে দেখা হয় তাই তুমি যাবে কিনা।।আবার তোমার জন্যও এটা নতুন একটা অনূভুতি হবে'।। আমি একটু হেসে বললাম, 'তা হয়তো সম্ভব হবে না, ঈশ্বরের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আমার জীবনে আছে,তাদের রেখে যাওয়া যাবে না'।। শালিকটা এবার একটু গম্ভীর হয়েই বললো, 'তুমি যাকে ভালোবাসো, সে তো তোমায় ভালোই বাসেনা।।তাহলে? এ কেমন প্রেম?' আমি ভারী নিঃশ্বাস ঠেলে ঘড়ঘড়ে গলায় বলে উঠলাম, 'ঠিক যেমন ঈশ্বরের সাথে আপনার প্রেম!'
৫/ ঈশ্বরের অসুখঃ
আপনি তাহলে মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়ছেন? লাইব্রেরীর কোনায় বসে থাকা মেয়েটা আমার পাশে এসে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলো।।কিছুটা অপ্রস্তুত গলায় উত্তর দিলাম, 'জ্বি'। আসলে সে সময় আমার মাথায় ঘুরছিলো মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তার জট খোলার মতো যন্ত্র আবিষ্কার এখনো হয়নি কেনো এ বিষয়ক দার্শনিক প্রশ্ন।।সে একটু হেসে বললো 'শুধু জ্বি! আপনি আসলেই কথা কম বলেন'। আবারো হকচকিয়ে গেলাম,আমি আসলেই কম কথা বলি এটা কি মেয়েটার জানার কথা? মুখে জিজ্ঞেস করলাম,'আমি কি আপনাকে চিনি?' কপালের কাছে নুয়ে পড়া ঘাসের মতো চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,' নাহ, তবে আমি আপনাকে চিনি'।। এ কথার জবাবে একটা হাসি দেওয়া ছাড়া আর কোনো উত্তর আমি খুঁজে পেলামনা।।মেয়েটা এবার জিজ্ঞেস করলো, 'আপনি কি তাহলে মন পড়তে পারেন?' চোখ দুটো বড় বড় করে একটু সামনে ঝুকে বললো,'আমার মনে কি চলছে বলতে পারবেন?' এটা অজানা প্রশ্ন না।।মনোবিজ্ঞানে পড়ছি শুনলে বেশীরভাগ মানুষের মাথায় এই প্রশ্নটাই প্রথমে আসে।।আমি মাথা নেড়ে বললাম,'শাস্ত্র এভাবে কাজ করেনা'। কথাটা বলার পর একটা নীরাবতা নেমে আসলো।।'জানতাম,আপনিও পারবেননা।।বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত, আসছি তাহলে'।।মেয়েটা উঠে চলে গেলো, সাথে সাময়িক একটা শূণ্যতা।।শাস্ত্রের বাইরে গিয়ে মন পড়ার ক্ষমতা আমার আছে।।মেয়েটার চোখের ভিতর দিয়ে হৃদয় হাতড়ে সম্পূর্ণ শূন্য দেখেও তাকে বলতে পারলামনা।।বলতে পারলামনা, 'ঈশ্বরের যে অসুখ তোমার মাঝে আছে তাতে ব্যাথা পেয়োনা। আমি আছি তোমার পাশে'।।ঠিক একথাটা শুনতেই সে আমার কাছে এসেছিল।। আমি আছি তোমার পাশে কথাটার দৈর্ঘ্য ছোটো কিন্তু ভার অনেক।।আমি বলতে পারিনি কারণ গতবার যাকে একথাটা বলেছিলাম সে পরজীবীর মতো মৃত্যুর আগে অসুখটা আমায় দিয়ে গিয়েছিল। আমি আর অসুস্থ হতে চাইনা,আমি বাঁচতে চাই।।
৬/ আফসানাঃ
বোমারু বিমানগুলো আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো জলপাই রঙের বোমা নিক্ষেপ করে যাচ্ছে। থামার কোনো লক্ষণই নেই।।আসলাম,শায়ের, ইকবালরা কোথায় আছে কে জানে।।বেঁচে আছে? কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা এখন আর নেই।।আমি আল্লাহ'র নাম জপতে জপতে কাঠের বিছানার নিচে শুয়ে আছি।।বোমা পড়লে বাঁচা সম্ভব হবেনা,বের হওয়ার মতো সাহসও পাচ্ছিনা।।এমন সময়ই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হলো।।ভেবেছিলাম মাথার উপরেই পড়েছে কিন্তু নাহ পড়েছে পাশের বিল্ডিং'এ।।এক মূহুর্তের জন্য সব থমকে গেলো,সব বোমারু বিমানের গর্জন, শিশুর কান্না, পৃথিবীর আত্ম-চিৎকার, সব।।ঠিক সে সময় আমার মনে হচ্ছিল, বোমাটা বিল্ডিংয়ের ইটের বদলে আমার দেহের সকল কোষ ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে গেছে।।
আমার জানালার বরাবরই আফসানার ঘরের জানালা।।প্রথম যেদিন এসেছিল সেদিন দেখা হয়েছিল এই জানালা দিয়েই।।সে মূহুর্তটা কি সহজে ভোলা যায়? তীক্ষ্ণ তরবারির মতো ভ্রূ কুঁচকিয়ে এমন ভাবে তাকিয়েছিল যেনো আমার পেটের সকল কথাই তার জানা হয়ে গেছে।।ঢোক গিলে একটা স্ফীত হাসি দিয়ে কোনোমতে পার পেয়েছিলাম।।তারপর কেটে গেছে অনেকদিন,অনেক রাগ-অভিমান হয়েছে,হাসিঠাট্টাও হয়েছে একই সাথে হয়েছে অনেক নীরব কাটিয়ে দেওয়া দিনের কবিতাপাঠ।। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হয়েছে কিন্তু আমার তাকে বলা হয়নি।।বলা হয়নি, তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার হাজার বছরের ঘোর কেটে গেছে। আচ্ছা মানুষ অভিমান করলে তার চোখজোড়া এতো সুন্দর দেখায় কেনো? হয়তো আর কখনো বলাও হবেনা।।সামনে তাকাতেই দেখলাম দেয়ালে আধছেঁড়া পোস্টারে লেখা কবিতারা আমার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হাসছে।।
"আবার দেখা হবে,
যুদ্ধ শেষে কিংবা হাশরের ময়দানে,
ভালোবাসার নামে কসম খেয়ে সেদিন আমরা হয়তো আবার একত্রিত হবো,
অনন্তকালের পথে নতুন যাত্রা করতে,
আবার দেখা হবে?
-16/03/22

0 Comments